Sep 29, 2021
116 Views
Comments Off on কাঠবাদামের উপকারিতা : প্রতিদিন কয়টি কাঠবাদাম খাওয়া উচিৎ?

কাঠবাদামের উপকারিতা : প্রতিদিন কয়টি কাঠবাদাম খাওয়া উচিৎ?

Written by

পৃথিবীতে বাদামের হরেক রকম প্রজাতির মাঝে কাঠবাদামের উপকারিতা ও পুষ্টিগুণের দিক থেকে বেশ জনপ্রিয় একটি নাম। দৈনন্দিন জীবনে খাদ্যদ্রব্য প্রস্তুতীকরণের পাশাপাশি সুষম খাদ্যাভ্যাস এমনকি সৌন্দর্য সচেতনতায়ও ব্যহৃত হচ্ছে এই কাঠবাদাম।

স্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টিউপাদানের আধার হিসেবে পরিচিত কাঠ বাদামের স্বাস্থ্য উপকারিতা সম্পর্কে জানার আগে চলুন একনজরে কাঠবাদাম সম্পর্কে কিছু সাধারণ তথ্য জেনে নেওয়া যাক।

কাঠবাদাম বা আমন্ড (almond) ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে জন্ম নেয়া এক বিশেষ শ্রেণীর উদ্ভিদ হতে প্রাপ্ত বাদাম। এটি পৃথিবীর প্রাচীনতম পুষ্টিকর খাবারগুলোর মাঝে একটি। এর বৈজ্ঞানিক নাম Prunus amygdalus

উদ্ভিদবিজ্ঞানের মতবাদ অনুযায়ী, আমরা কাঠবাদাম হিসেবে যা খেয়ে থাকি তা আসলে বাদাম নয়, বরং ড্রুপ (drupe) নামে পরিচিত। হালকা শক্ত কাঠের ন্যায় বাদামি আবরণের আচ্ছাদনে থাকা মাংসল বীজটিকেই আমরা কাঠবাদাম হিসেবে খেয়ে থাকি।

সূচীপত্র

কাঠবাদামের উপকারিতা

আমরা সকলেই সাধারণভাবে জানি যে কাঠবাদাম আমাদের সুস্বাস্থ্যের জন্য উপকারী; কিন্তু এর স্বাস্থ্যগত উপকারিতা সম্পর্কে বিশদভাবে আমরা অনেকেই অবগত নই।

একইসাথে আমরা অনেকেই এখনো জানিনা যে আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসে কি পরিমাণ কাঠবাদাম অন্তর্ভুক্ত করলে তা সুষম ডায়েট প্ল্যানের অন্তর্ভুক্ত হবে। চলুন, কাঠ বাদাম খাওয়ার উপকারিতাগুলো জেনে নেই।

১। পুষ্টিগুণাবলীর আকর

কাজু বাদাম এর ন্যায় কাঠবাদামেও দেহের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানের প্রায় সবই আছে। উদ্ভিজ্জ ফ্যাট, মিনারেল, প্রোটিনসহ নানান রকম ভিটামিনের খুব মূল্যবান উৎস এই কাঠবাদাম।

2015–2020 Dietary Guidelines for Americans এর তথ্য অনুযায়ী কাঠবাদামের পুষ্টিগুণ ও দৈনন্দিন চাহিদা সম্পর্কিত একটি চার্ট উল্লেখ করা হলো-

পুষ্টি উপাদান পরিমাণ (১ আউন্স) প্রাপ্তবয়স্কদের দৈনিক প্রয়োজন  
শক্তি (ক্যালোরি) ১৬৪ ১৮০০-৩০০০
কার্বোহাইড্রেট/শর্করা (গ্রাম) ৬.১ গ্রাম (১.২ গ্রাম চিনি সহ) ১৩০
চর্বি (গ্রাম) ১৪.২, যার মধ্যে ১২.৪ গ্রাম অসম্পৃক্ত দৈনিক ক্যালরির ২০-৩৫%
ফাইবার (গ্রাম) ৩.৫ ২৫.২-৩০.৮
প্রোটিন (গ্রাম) ৬.০ ৪৬-৫৬
ক্যালসিয়াম (মিলিগ্রাম) ৭৬.৩ ১০০০-১২০০
আয়রন (মিলিগ্রাম) ১.০ ৮-১৮
ম্যাগনেসিয়াম (মিলিগ্রাম) ৭৬.৫ ৩১০-৪২০
ফসফরাস (মিলিগ্রাম) ১৩৬ ৭০০
পটাসিয়াম (মিগ্রা) ২০৮ ৪৭০০
জিংক (মিলিগ্রাম) ০.৯ ৮-১১
কপার (মিলিগ্রাম) ০.৩ ৯০০
ম্যাঙ্গানিজ (মিলিগ্রাম) ০.৬ ১.৮-২.৩
সেলেনিয়াম (মাইক্রোগ্রাম) ১.২ ৫৫
ফোলেট (মাইক্রোগ্রাম) ১২.৫ ০০—০০
ভিটামিন ই (মিলিগ্রাম) ৭.২৭ ১৫
কোলেস্টেরল কোন তথ্য নেই

এছাড়াও একই পরিমাণ কাঠবাদাম থেকে আপনি পাবেন যথেষ্ট পরিমাণে ভিটামিন বি-১২ (রিবোফ্লাভিন) যা প্রায় ১৬১ ক্যালরি খাদ্যশক্তি এবং ২.৫ গ্রাম ডাইজেস্টিভ কার্বোহাইড্রেট সরবরাহ করে।

২। অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের সমৃদ্ধ উৎস

কাঠবাদামে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা আমাদের দেহকোষকে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে।

উল্লেখ্য, আমাদের দেহে ঘটতে থাকা বিভিন্ন শারীরিক প্রক্রিয়া এবং পরিবেশগত প্রভাবের কারণে দেহে অনেক ফ্রি র‍্যাডিক্যাল সৃষ্টি হয়, যার ফলে এই অক্সিডেটিভ স্ট্রেস দেখা দেয়। অক্সিডেটিভ স্ট্রেসের ফলে প্রদাহ, বার্ধক্য এবং ক্যান্সারের মতো দুরারোগ্য ব্যাধি দেখা দেয়।

এছাড়াও কাঠবাদামে প্রচুর পরিমাণে রয়েছে ফাইটিক এসিড (phytic acid) নামের একটি পুষ্টিকর অ্যান্টিঅক্সিডেন্টাল যৌগ, যা আমাদের দেহের কিছু গুরুত্বপূর্ণ খনিজ পদার্থকে আবদ্ধ করে এবং তাদের শোষণে বাধা দেয়।

এছাড়াও এটি বাদাম থেকে পাওয়া আয়রন, জিংক এবং ক্যালসিয়ামের পরিমাণও কিছুটা কমিয়ে দেয়।

পুষ্টিবিদদের মতে, প্রতিদিন অন্তত ৮৪ গ্রাম কাঠবাদাম খাওয়ার মাধ্যমে দেহে অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের মাত্রা বৃদ্ধি পায়, যা আমাদেরকে বার্ধক্য এবং অন্যান্য মারাত্মক রোগ থেকে রক্ষা করতে সক্ষম।

৩। ভিটামিন ই এর ভাল উৎস

কাঠবাদামে তুলনামূলকভাবে উচ্চ মাত্রার ভিটামিন ই থাকে। এক আউন্স (২৮.৪ গ্রাম) কাঠবাদামে রয়েছে প্রায় ৭.২৭ মিলিগ্রাম ভিটামিন-ই, যা একজন ব্যক্তির দৈনন্দিন পুষ্টি প্রয়োজনের প্রায় অর্ধেক। কাঠবাদামে থাকা ভিটামিন-ই আলঝেইমার রোগ (Alzheimer’s disease) এবং হৃদরোগের নিম্নহার বজায় রাখতে সক্ষম।

২০১৬ সালের একটি পুনঃমূল্যায়নী উৎস হতে প্রাপ্ত তথ্য মোতাবেক, ভিটামিন ই-তে থাকা আলফা-টোকোফেরল (alpha-tocopherol) নামের এক প্রকার অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ক্যান্সারের ঝুঁকি কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এটি নিশ্চিত করার জন্য আরো শক্তিশালী প্রমাণসাপেক্ষতা প্রয়োজন বলে ধারণা করছেন গবেষকরা।

তবে ভিটামিন ই তে স্বয়ংসম্পূর্ণ হবার আশায় প্রয়োজনের অতিরিক্ত কাঠবাদাম না খাওয়াই শ্রেয়, কেননা অতিরিক্ত পরিমাণে ভিটামিন ই দেহে প্রোস্টেট ক্যান্সারের ঝুঁকিও বাড়ায়।

৪। রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণ করে

কাঠবাদামে কার্বোহাইড্রেটের স্বল্পতা এবং স্বাস্থ্যকর ফ্যাট, ফাইবার ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ পদার্থের প্রাচূর্যতা থাকায় এটি রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণে সক্ষম। কাঠবাদামে বিদ্যমান ম্যাগনেসিয়াম এমন একটি খনিজ যা ৩০০ টিরও বেশি শারীরিক প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়, যার মাঝে রক্তে শর্করার নিয়ন্ত্রণ অন্যতম।

আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, টাইপ ২ ডায়াবেটিস এর ২৫-৩৮ শতাংশ লোকের মধ্যে ম্যাগনেসিয়ামের অভাব রয়েছে। কাঠবাদাম এই ঘাটতি সংশোধন করে রক্তে শর্করার মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করে এবং ইনসুলিনের কার্যকারিতা উন্নত করে।

২০১১ সালের একটি গবেষণা অনুযায়ী, টাইপ ২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ২০ জন ব্যক্তি ১২ সপ্তাহের জন্য প্রতিদিন ৬০ গ্রাম কাঠবাদাম খেতে বলা হয়; এবং পরবর্তীতে তাদের দেহে রক্তের শর্করা এবং লিপিড বা চর্বির মাত্রায় সামঞ্জস্যতা দেখা যায়।

তবে ডায়াবেটিসে যারা আক্রান্ত নন, তারাও ইনসুলিনের কার্যকারিতার উন্নয়নে কাঠবাদাম খেতে পারেন।

৫। রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা কমায়

২০০৫ সালের একটি বিশ্বস্ত সূত্রের গবেষণা মোতাবেক, কাঠবাদামের ভিটামিন ই এমন একটি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যা অক্সিডাইজেশন প্রক্রিয়া বন্ধ করতে সাহায্য করে। এই অক্সিডাইজেশন প্রক্রিয়ার ফলে কোলেস্টেরল ধমনীতে আটকা পড়ে।

রক্তে এলডিএল লাইপোপ্রোটিন (LDL lipoprotein) বা “খারাপ” কোলেস্টেরলের উচ্চমাত্রার কারণে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে। কাঠবাদামে আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট (unsaturated fat) বা অসম্পৃক্ত চর্বি বিদ্যমান, যা LDL বা “খারাপ” কোলেস্টেরলের ঝুঁকি বাড়ায় না। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন (AHA) এর মতে, কাঠবাদামের অসম্পৃক্ত চর্বি একজন ব্যক্তির রক্তের কোলেস্টেরলের অবস্থা উন্নত করতে পারে। তাছাড়া, এই বাদামে কোনপ্রকার কোলেস্টেরল থাকে না।

এছাড়াও ২০১৮ সালে সংঘটিত একটি গবেষণায় জানা গিয়েছে যে, কাঠবাদামের পুষ্টিউপাদানগুলো এইচডিএল লাইপোপ্রোটিন (HDL) বা “ভাল” কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়াতে বা বজায় রাখতে সহায়তা করে। তাই পুষ্টিবিদরা হৃদযন্ত্রের সুরক্ষার জন্য প্রতিদিন প্রায় ৪৫ গ্রাম কাঠবাদাম খাওয়ার পরামর্শ দেন। এতে করে “ভাল” কোলেস্টেরল বজায় থাকে এবং খারাপ কোলেস্টেরল প্রায় ৫.৩ মিগ্রা/ডিএল কমে যায়।

৬। হৃদরোগের ঝুঁকি কমে

কাঠবাদাম যেহেতু অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ, এটি রক্তের লিপিডের মাত্রা সুনিয়ন্ত্রিত রেখে আমাদের দেহের রক্তপ্রবাহকে স্বাভাবিক রাখে। ফলশ্রুতিতে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং হৃদরোগের ঝুঁকি হ্রাস পায়।

২০১৪ সালের একটি গবেষণায় ২০-৭০ বছর বয়সী সুস্থ পুরুষদের ৪ সপ্তাহের জন্য প্রতিদিন ৭০ গ্রাম করে কাঠবাদাম খেতে দেয়া হয়। পরবর্তীতে তাদের ক্ষেত্রে উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা কমে গিয়ে রক্তপ্রবাহের স্বাভাবিক মাত্রা নিয়ন্ত্রিত থাকে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কাঠবাদামে থাকা ফ্ল্যাভোনয়েড (flavonoid) নামক অ্যান্টিঅক্সিডেন্টাল যৌগটির প্রভাবেই এরকম সম্ভাবনা দেখা দেয়।

তাছাড়া কাঠবাদাম আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটসম্পন্ন হওয়াতে খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা কমে যাওয়ায় এমনিতেও এটি হৃদযন্ত্রের সুস্থতা নিশ্চিত করে। পাশাপাশি এর ম্যাগনেসিয়ামও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।

উল্লেখ্য, ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের বাসিন্দাদের দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসে কাঠবাদাম অন্তর্ভুক্ত থাকায় তুলনামূলকভাবে তারা সুস্থ হৃদযন্ত্রের অধিকারী।

৭। ক্যান্সার প্রতিরোধে সক্ষম

কাঠবাদামে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার থাকে যা শরীরকে ডিটক্সিফাই করতে সাহায্য করে। এতে করে আমাদের পরিপাকতন্ত্রে বিদ্যমান কিছু ক্ষতিকর প্যাথোজেনিক ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস হবার ফলে পরিপাকতন্ত্র সচল থাকে এবং কোলন ক্যান্সারের ঝুঁকি কমে।

এছাড়াও এতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ই এবং ফ্ল্যাভোনয়েড রয়েছে যা ব্রেস্ট ক্যান্সার নিয়ন্ত্রণ করে।

২০১৫ সালের একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে, যারা কাঠবাদাম, আখরোট এবং চিনাবাদাম খেতে অভ্যস্ত, তাদের ক্ষেত্রে ব্রেস্ট ক্যান্সারের ঝুঁকি দুই থেকে তিন গুণ কমে যায়।

৮। ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক

কাঠবাদাম আমাদের দেহের বিপাক প্রক্রিয়াকে উন্নত করে, যার ফলে খাদ্যদ্রব্য খুব সহজেই হজম হয়। কাঠবাদামের প্রোটিন ও ফাইবারের প্রভাবে মেটাবলিজম পাওয়ার খুব সহজেই বুস্ট হয়।

এর ফলে আমাদের পাকস্থলী দীর্ঘসময় পর্যন্ত পরিপূর্ণ থাকে, এবং ক্ষুধা কম লাগে। ফলশ্রুতিতে, কম ক্যালরি গ্রহণ করার কারণে ধীরে ধীরে ওজন হ্রাস পায়।

পাবমেড সেন্ট্রাল (PubMed Central) থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৩৭ জন অংশগ্রহণকারীর মধ্যে চার সপ্তাহের একটি গবেষণায় তাদের দৈনিক ১.৫ আউন্স (৪৩ গ্রাম) কাঠবাদাম পরিবেশন করা হয়। ফলাফলে তাদের ক্ষুধা এবং অতিরিক্ত খাওয়ার ইচ্ছা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।

এছাড়াও ১০০ জন ওভারওয়েট মহিলাদের উপর করা আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে যে যারা কাঠবাদাম খেতে অভ্যস্ত তারা কাঠবাদাম খাওয়ায় অনভ্যস্তদের চেয়ে তুলনামূলকভাবে পেট ও কোমরের মেদ ঝরাতে সক্ষম হয়েছেন।

৯। হাড়ের সুস্থতা বজায় রাখে

কাঠবাদামে বিদ্যমান ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, কপার, ভিটামিন কে, প্রোটিন এবং জিংক হাড়ের সুস্থতা বজায় রাখতে সব সময়ই কার্যকর। কাঠবাদামকে তাই হাড় গঠনের সুষম খাদ্য বলা হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, ১ আউন্স কাঠবাদামে যে পরিমাণ ক্যালসিয়াম আছে, তা অন্তত ০.২৫ কাপ দুধে বিদ্যমান ক্যালসিয়ামের সমান।

এছাড়াও কাঠবাদামে থাকা ফসফরাস দেহকাঠামোকে মজবুত ও সুগঠিত রাখে, যার ফলে ফ্র্যাকচার, অস্টিওপোরোসিসের মত রোগের ঝুঁকি কমে।

১০। চোখের সুস্বাস্থ্য নিয়ন্ত্রণ

চোখের সুস্থতার জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য গাজরের তুলনায় কাঠবাদামে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ই, যা আমাদের চোখের লেন্সের অস্বাভাবিক পরিবর্তন রোধ করে। তাই চোখের সুরক্ষার জন্য নিয়মিত কাঠবাদাম খাওয়া জরুরি।

১১। রক্তশূন্যতা প্রতিরোধক

কিছু শারীরিক জটিলতার কারণে দেহের লোহিত রক্তকণিকার কার্যক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়, ফলে এরা মস্তিষ্কে অক্সিজেন সরবরাহ কমিয়ে দেয়।

কাঠবাদামে রয়েছে কপার, আয়রন এবং গুরুত্বপূর্ণ ভিটামিনের সমাহার, যা হিমোগ্লোবিন তৈরিতে সাহায্য করে। ফলস্বরূপ, রক্তশূন্যতা প্রতিরোধে দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসে কাঠবাদাম ব্যবহার করা যেতে পারে।

১২। মস্তিষ্ক ও স্নায়ুর কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করে

কাঠবাদাম শুধু আমাদের শারীরিক কর্মদক্ষতাকেই উদ্দীপ্ত করে তা নয়, বরং মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও রয়েছে এর বহুমূখী অবদান। এতে রয়েছে এল-কার্নিটাইন (L-carnitine) এবং রিবোফ্লাভিন (riboflavin) যা মস্তিষ্কের কোষ বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।

এছাড়াও কাঠবাদামে বিদ্যমান ফেনিল্যালানাইন (phenylalanine) নামক রাসায়নিক যৌগটি মস্তিষ্কের কগনিটিভ ফাংশনে (cognitive function) সাহায্য করে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্রতিদিন সকালে অন্ততপক্ষে পাঁচ টুকরো কাঠবাদাম খাওয়ার ফলে আপনার মস্তিষ্কের শক্তি বৃদ্ধি পেতে সক্ষম।

এছাড়াও, কাঠবাদামে যে পরিমাণ ম্যাগনেসিয়াম রয়েছে তা আমাদের স্নায়ুতন্ত্রের কর্মদক্ষতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। ম্যাগনেসিয়াম আমাদের স্নায়ুকে ঠান্ডা রাখে, মন মেজাজ স্থিতিশীল রাখে এবং এর ফলে ঘুম ভালো হয়।

১৩। স্মৃতিশক্তি প্রখর করে

আমন্ড মিল্ক বা কাঠবাদামের নির্যাস সমৃদ্ধ দুধ পটাসিয়ামে সমৃদ্ধ এমন একটি পুষ্টিকর পানীয়, যা আমাদের দেহে ইলেক্ট্রোলাইটের সংখ্যা বৃদ্ধি করে। ফলশ্রুতিতে আমাদের দৈহিক শক্তি বৃদ্ধির পাশাপাশি স্মৃতিশক্তিও প্রখর হয়। তাই মায়েদের উচিত তাদের অধ্য্যনরত সন্তানদের নিয়মিতই কাঠবাদাম-দুধ পানে উৎসাহিত করা।

১৪। ত্বক সুন্দর রাখে

কাঠবাদামে বিদ্যমান ফ্ল্যাভোনয়েড ত্বকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি যোগায় এবং বার্ধক্যজনিত বলিরেখা দুর করতে সাহায্য করে। পাশাপাশি এই বাদামে রয়েছে ফ্যাটি অ্যাসিড যা ব্রণ, ব্ল্যাকহেডস এবং হোয়াইটহেডসের বিরুদ্ধে লড়াই করে এসব প্রতিরোধে সক্ষম। এই ফ্যাটি অ্যাসিডগুলি ত্বকের ছিদ্রগুলোতে আটকে থাকা তেল বা সেবামকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং ব্রণ বা অ্যাকনের সম্ভাবনা কমে যায়।

এছাড়াও ত্বকের যেকোন দাগ বা স্টেচ মার্কস সারিয়ে তুলতেও আমন্ড অয়েল বা কাঠবাদামের তেলের কোন জুড়ি নেই। এজন্য আমন্ড অয়েল হালকা গরম করে তা স্ট্রেচযুক্ত স্থানে লাগিয়ে রাখতে হবে কমপক্ষে এক ঘন্টা। দিনে দুবার করে নিয়মিত এই প্রক্রিয়াটি অবলম্বনের ফলে ইতিবাচক ফলাফল আসতে বাধ্য।

১৫। চুল স্বাস্থোজ্জ্বল রাখে

আপনার চুল যদি নিষ্প্রাণ এবং আর্দ্রতাশূন্য হয়ে পড়ে, এর জন্যও সহায়ক ভূমিকা পালন করে এই আমন্ড অয়েল। এটি চুলকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি যোগানোর মাধ্যমে চুলকে ঝলমলে ও সিল্কি করে তোলে।

এছাড়াও আমাদের দেহে ম্যাগনেসিয়ামের ঘাটতি দেখা দিলে চুল পড়ার মত সমস্যা দেখা দেয়। এর জন্য সরাসরি কাঠবাদাম খাওয়ার পাশাপাশি নিয়মিত আমন্ড অয়েলের ব্যবহারে চুল পড়া রোধ হয় এবং এর পাশাপাশি নতুন চুল গজানো ও চুল ঘন করতে সাহায্য করে। এছাড়াও আমন্ড অয়েল ব্যবহারে খুশকি দুর হয় এবং চুল ধূসর হওয়া নিয়ন্ত্রণে থাকে।

১৬। জন্মগত ত্রুটি রোধ করে

কাঠবাদামে রয়েছে ফলিক অ্যাসিড যা সুস্থ কোষ বৃদ্ধিতে একটি অবিচ্ছেদ্য ভূমিকা পালন করে এবং ক্রমবর্ধমান ভ্রূণের জীবনচক্রকেও সাহায্য করে।

তাই গর্ভবতী নারীদের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় কাঠবাদাম রাখা উচিত, যা তাদের সন্তানকে যে কোন ধরণের জন্মগত ত্রুটি হতে রক্ষা করতে সাহায্য করতে পারে।

কাঠ বাদাম খাওয়ার ঝুঁকি ও সতর্কতা

বিশেষজ্ঞরা বলেন, কাঠবাদাম স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হলেও ক্ষেত্রবিশেষে রয়েছে এর কিছু ঝুঁকি ও সীমাবদ্ধতা। সেগুলো নিম্নরূপঃ

১। অ্যালার্জি

যাদের কাঠবাদামে অ্যালার্জি রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে শরীরে তীব্র চুলকানি, ফোলা ফোলা ভাব, শ্বাসপ্রশ্বাসে সমস্যার পাশাপাশি কখনো কখনো অ্যানাফিল্যাক্সিস (anaphylaxis) নামক প্রাণঘাতী সমস্যাও দেখা দিতে পারে।

এক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তিকে দ্রুত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিতে হবে। এছাড়াও কাঠবাদাম সংক্রান্ত অ্যালার্জিতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের খাদ্যদ্রব্য পরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়া উচিত যে সেখানে কাঠবাদাম নেই।

২। শ্বাসকষ্ট

অ্যাজমা বা শ্বাসকষ্টে আক্রান্তদের, বিশেষ করে ছোট বাচ্চা এবং বয়স্কদের ক্ষেত্রে কাঠবাদাম বা এর তৈরি কোন খাদ্যবস্তু দেয়ার ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।

এছাড়াও অতিরিক্ত পরিমাণ কাঠবাদাম খাওয়ার ফলে যেসব সমস্যা দেখা দেয় সেগুলো হলোঃ

  • বমি বমি ভাব বা বমি
  • খাবার গিলতে অসুবিধা
  • ডায়রিয়া
  • ওজন বৃদ্ধি
  • হজমে সমস্যা
  • কিডনিতে পাথর হবার সম্ভাবনা
  • কাঠবাদামের এলার্জি হবার ঝুঁকি
  • নেশাগ্রস্থতা

এছাড়াও কাঠবাদাম সেবনের ক্ষেত্রে আগে এই ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া উচিত যে এটি তেতো না মিষ্টি। কিছু ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক চেতনানাশক হিসেবে তেতো কাঠবাদাম ব্যবহৃত হয়।

তবে সরাসরি খাদ্য হিসেবে এটি খুবই বিপদজনক কেননা এতে রয়েছে গ্লাইকোসাইড অ্যামিগডালিন (glycoside amygdalin) যা খাদ্য হিসেবে সেবন করলে পাকস্থলীতে যেয়ে বিষাক্ততার সৃষ্টি করে।

এছাড়াও তেতো কাঠবাদাম উত্তপ্ত করলে এটি বিষাক্ত হাইড্রোজেন সায়ানাইড (hydrogen cyanide) উৎপন্ন করে যা তাৎক্ষণিক ঘাতক হিসেবে পরিচিত।

দিনে কয়টি কাঠবাদাম খাওয়া উচিত?

কাঠবাদাম খাওয়ার পরিমাণ নির্ভর করে ব্যক্তি কি উদ্দেশ্যে কাঠবাদাম খাচ্ছেন বা খাবেন তার উপর। বিশেষজ্ঞরা বলেন, যদি কেউ ওজন বাড়াতে চান, সেক্ষেত্রে সকালের নাস্তা থেকে শুরু করে দিনে প্রায় ৪০টির মত কাঠবাদাম খাওয়া উচিত। আর ওজন কমানোর ক্ষেত্রে সকালের নাস্তায় দুধের সাথে পাঁচটি কাঠবাদাম খেলেই যথেষ্ট।

শেষ কথা

পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস সুস্থ জীবনের পক্ষে আশীর্বাদস্বরূপ। আপনি যদি স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনে অভ্যস্ত হতে চান, তাহলে দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় কাঠবাদাম যোগ করতে ভুলবেন না। কেননা, শারীরিকভাবে কর্মক্ষম থাকার পাশাপাশি মানসিক ইতিবাচকতা নিশ্চিত করতেও কাঠবাদামের কোন জুড়ি নেই।

Article Categories:
Health

Comments are closed.

close